অপারেশন খরচ খাতা: প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ভয়ংকর এক গণহত্যার নাম

📅 June 13, 2026 👁️ 544 views 📌 News
অপারেশন খরচ খাতা: প্রতারণার ফাঁদে ফেলে ভয়ংকর এক গণহত্যার নাম

দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৩ জুন। ট্রেনে করে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ৪৩৭ জন নিরীহ মানুষকে কচুকাটা করা হয়েছিলো ছবিতে থাকা এই স্থানে, সেদিন ছবির এই কালভার্ট আর রেললাইন পরিনত হয়েছিলো লাশের মহাসমুদ্রে।



নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শহরে বাস করতেন বিপুল সংখ্যক মাড়োয়ারি। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক, যাঁরা ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের বহু আগেই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুরে এসে এই শহরে থেকে যান। এরা স্থানীয় হয়ে যান সৈয়দপুরেই।



মুক্তিযুদ্ধ শুরুর তিনদিন আগে ২৩ মার্চ রাত থেকে সৈয়দপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর সৈয়দপুরের বিহারিরা বাঙালি নিধন শুরু করে। মহল্লায়-মহল্লায় ঢুকে নেতৃস্থানীয় বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এ অবস্থায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল শহরের মাড়োয়ারিপট্টির বাসিন্দাদের। ২৪ মার্চ থেকে সৈয়দপুর শহরের বাঙালি পরিবারগুলো পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।


সৈয়দপুরের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে স্থানীয় মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের শীর্ষব্যক্তিত্ব তুলসীরাম আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া, রামেশ্বর লাল আগরওয়ালাকে ১২ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাসের অদূরে নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। মাড়োয়ারিপট্টিতে আ/তঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিহারিরা মাড়োয়ারিদের বাসায় বাসায় চালায় লুটতরাজ।


এর মধ্যে চলে এলো জুন মাস। জুন মাসের ৫ তারিখে হঠাৎই পাকিস্তানি বাহিনী মাইকে ঘোষণা শুরু করে। ঘোষণায় বলা হয়, "যাঁরা হিন্দু মাড়োয়ারি তাঁদের নিরাপদ স্থান ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি ১৩ জুন মাড়োয়ারিদের বর্ডার অব্দি পৌঁছে দিবে।"

তখনো কেউই অনুমান করতে পারেনি কি হবে সামনে, কি ভ/য়ংকর অধ্যায় আসছে তাঁদের সামনে।


৫ দিন ঘোষণা চলে আর এদিকে নিরীহ মাড়োয়ারীরা বুক বেঁধেছে আশায়। আগের রাত থেকেই সাড়ে চারশর বেশি মাড়োয়ারি অপেক্ষমান সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে। ট্রেনে যদি জায়গা না পাওয়া যায় সেই আশঙ্কায় আগেই হাজির হয়ে গিয়েছিলেন মাড়োয়ারিরা। ভোর পাঁচটার দিকে ট্রেন আসতেই ট্রেনের চারটি বগিতে গাদাগাদি, হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়েন মাড়োয়ারিরা। বাক্স পেটারা আর মানুষে পূর্ণ তখন ট্রেন। অপেক্ষা কখন ট্রেন ছাড়বে। ট্রেন ছাড়ার আর কতো দেরি। অপেক্ষার তর সইছেনা তাদের। মনে একদিকে উত্তেজনা, অন্যদিকে ভয় কাটিয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার অপেক্ষা।


অবশেষে নির্ধারিত সকাল ১০টায় ট্রেনটি ছাড়ে। ট্রেন ছাড়ার পর সব জানালা-দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিলো। ট্রেনটি ধীরগতিতে দুই মাইলের মতো পথ অতিক্রম করার পর শহরের গোলাহাটের কাছে এসে থেমে যায়। সবাই আশ্চর্য হয়ে ভাবছে কী হলো, ট্রেন থেমে গেল কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি! ভয় ও শঙ্কা দেখা দিলো তাদের চোখেমুখে।


অন্যদিকে বিহারী ও রাজাকার ইজাহার আহমেদ, বিহারী নেতা কাইয়ুম খান ও বিপুলসংখ্যক বিহারী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী সৈন্য উপস্থিত তখন গোলাহাটে সেই ট্রেনটিরই অপেক্ষায়। ট্রেন থামতেই প্রতিটি বগির দরজা খুলে ভেতরে রাম/দা হাতে কয়েকজন বিহারি প্রবেশ করে, বাইরে তখন ভারী আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছে। যেন একজন মাড়োয়ারিও পা/লাতে না পারে। শুরু হয় রামদা দিয়ে কোপানো। মুহূর্তের মধ্যেই বীভৎস আর পৈশাচিক উৎসবে মেতে ওঠে বিহা/রীরা। কোনো কোনো লাশকে কয়েক টুকরো করে রেললাইনের চারপাশে ছুড়ে ফেলা হয়। নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় শিশুদের।


মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহীদ হন ৪৩৭ জন নিরীহ মানুষ। ওই হত্যাযজ্ঞ থেকে কোনোরকমে আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন প্রাণে বেঁচে যান মাত্র ১০ জন যুবক। তারা ট্রেন থেকে নেমে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে দিনাজপুরে যান।


সেদিনের সেই পৈশাচিক গণহত্যা থেকে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া সেই দশ যুবকের মধ্যে একজন তপন কুমার দাস। সেদিনের সেই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাস দিয়েছিলেন গণহত্যার বর্ণনা।


তিনি বলেছিলেন, 'পাকিস্তানী সেনারা ১৩ই জুন আনুমানিক সকাল ৫টায় ভারতে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে ৪টি বগিতে আমাদের তোলে। ট্রেনে উঠার পরই পাকিস্তানী সেনাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না এই দিন আমাদের শেষ দিন। সে সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিলো। ঠিক সকাল ১০টার দিকে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। চলছিল ধীরে ধীরে। শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়েই হঠাৎ থেমে যায় ট্রেন। জায়গাটা স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে। নাম গোলাহাট। ট্রেন থামার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করি আমি। বাইরে সারি সারি পাকিস্তানি হানাদার সেনা। সঙ্গে তাদের দোসর বিহারীরা। সেনা সদস্যদের হাতে রাইফেল। আর বিহারীদের হাতে ধারালো রামদা। পাকিস্তানী সৈন্যরা যাত্রীদের কিল- ঘুষি- লাথি মেরে ট্রেন থেকে নামাতে থাকে। ট্রেনের যাত্রীদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করতে শুরু করে। যাত্রীদের অনেকে ধারালো অস্ত্রের আঘাত সইতে না পেরে গুলি করে মা/রার জন্য অনুরোধ করে। পাকিস্তানী সেনাদের জবাব ছিল একটি গুলির অনেক দাম। একে একে বগি থেকে নামিয়ে তলোয়ার দিয়ে কাটতে শুরু করে। ট্রেনের একপাশে যখন গণহত্যা চলছিলো সে সময় অন্য পাশ থেকে আমিসহ কয়েক জন যুবক দশ পনেরো ফুট নিচে লাফ দিয়ে পড়ি। তখন অনেক বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমরা বৃষ্টির মধ্যে দৌড় দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করি। পাকি/স্তানী সেনারা পিছন থেকে আমাদের গুলি করতে থাকে, আমরা কয়েকজন পালিয়ে নিজেদের রক্ষা করলেও ওই ট্রেনের প্রায় ৪১৩ জন যাত্রী শহীদ হন।'


সেদিনের সেই পৈশাচিক গণহত্যা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন গোবিন্দ চন্দ্র দাস। তিনিও পালিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে উর্দুতে বলতে থাকেন, একজন একজন করে নেমে আসো। তোমাদের মারতে এসেছি আমরা। তবে পাকিস্তানের দামি গু'লি খরচ করা হবে না। সকলকে এ কোপে বলি দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ। ধারালো রামদা দিয়ে কেটে ফেলা গলা। ওই হত্যাযজ্ঞে শিশু, বৃদ্ধ, নারীরাও রেহাই পাননি।'


আজ ১৩ জুন, সেই নীলফামারীর কুখ্যাত গোলাহাট গণহত্যা দিবস। যাকে বলা হয় "অপারেশন খরচাখাতা" নামে। বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো শহীদদের প্রতি।


কার্টেসি: আহমাদ ইশতিয়াক/ বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র

← Back to News