কীভাবে হারিয়ে গেল বাংলাদেশে রোববারের ছুটি

📅 August 11, 2026 👁️ 510 views 📌 News
কীভাবে হারিয়ে গেল বাংলাদেশে রোববারের ছুটি

সপ্তাহ নামের সাতটা দিনের গোলকধাঁধা আমাদের সবারই চেনা। কাজের চার দিন পার হতেই মনে হয়, শনি-রবি বুঝি আর আসবেই না। আবার শনি-রবি আসতে না আসতেই সোম এসে দুয়ারে খটখট করে।

মজার ব্যাপার হলো, এই সাত দিনের সপ্তাহের ধারণাটির জন্ম আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনে। তখন কোনো কর্পোরেট বস ছিল না, ডেডলাইন ছিল না; ছিল স্রেফ আকাশের চাঁদ-তারা দেখে দিন গোনার অভ্যাস। ইহুদিরা বলল, ছয় দিন খাটাখাটুনির পর শনিবার ছুটির দিন। ব্যস।

খ্রিষ্টানরা আবার এক কাঠি এগিয়ে বলল, না, রোববার হচ্ছে যিশুর পুনরুত্থানের দিন। সুতরাং রোববারই আসল ছুটি।

কিন্তু বিশ্বজুড়ে রোববার ছুটির দিন হিসেবে পাকাপোক্ত সিলমোহর পেল কীভাবে?

এখানে এলেন রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন, সময়টা ৩২১ খ্রিষ্টাব্দ। তিনি সূর্য-উপাসনা আর খ্রিষ্টধর্ম—দুটিকেই সমান খাতির করতে গিয়ে নির্দেশ দিলেন, রোববার হবে সূর্যদেবের পবিত্র দিন আর ওই দিন সারা সাম্রাজ্যে কাজকর্ম বন্ধ থাকবে। ব্যস, রোমান সাম্রাজ্য থেকে সেই ছুটির ভাইরাস ইউরোপজুড়ে ছড়াল। তারপর ইউরোপীয়রা যখন জাহাজ সাজিয়ে বিশ্বজয়ে বেরোল, তারা বাণিজ্য আর বন্দুকের সাথে সাথে রোববার ছুটির সংস্কৃতিটাও উপনিবেশগুলোতে বিনামূল্যে পেঁয়াজের কলার মতো বিলিয়ে দিয়ে এল।

আধুনিক যুগে এই রোববারের সঙ্গে শনিবার কীভাবে জোড়া লাগল?

তার কৃতিত্ব কোনো সন্ন্যাসী বা রাজনৈতিক নেতার নয়, বরং এক গাড়ির কারখানা মালিকের—হেনরি ফোর্ড। ১৯২৬ সালে ফোর্ড সাহেব ভাবলেন, শ্রমিকদের যদি সপ্তাহে দু’দিন ছুটি দেওয়া যায়, তবে তারা কিছুটা বিশ্রাম পাবে, কেনাকাটা করবে, আর সবচেয়ে বড় কথা—তার তৈরি গাড়ি চড়ে ঘুরতে বেরোবে! অর্থাৎ, ছুটি দিলে গাড়ি বিক্রি বাড়বে। ধনতন্ত্র আর শ্রমিকের আরামের এই অদ্ভুত রসায়ন থেকেই জন্ম হলো আধুনিক দুই দিনের উইকএন্ড (শনি-রবি)।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদের এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে সেই রাজকীয় রোববারের ছুটি হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল কীভাবে?

স্বাধীনতার পর থেকে এই ভূখণ্ডে রোববারের ছুটির পুরনো ঐতিহ্যই চলে আসছিল—যা ছিল ব্রিটিশদের দিয়ে যাওয়া উপহার। কিন্তু ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের মসনদে বসলেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সামরিক শাসনের মেজাজই আলাদা, কিছু একটা কাণ্ড করে ইতিহাস তৈরি করতে হয়। ১৯৮৪ সালের ১৫ মার্চ সিদ্ধান্ত হলো, আর ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর—ছুটির দিন আর রোববার থাকছে না, হয়ে গেল শুক্রবার।

কথা হলো, জনগণ কি রাস্তায় নেমে জুমার দিনে ছুটির জন্য মিছিল করেছিল? না। কোনো ধর্মীয় দল কি স্মারকলিপি দিয়েছিল? একদম না। এরশাদ সাহেব হঠাৎ উপলব্ধি করলেন, ধর্মের সেন্টিমেন্ট ছুঁয়ে দিতে পারলে ক্ষমতার গদিটা আরেকটু মসৃণ হয়। ব্যস, ছুটির দিন বদলে গেল।

এরপর ছুটির ইতিহাস আরও গোলমেলে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে বলল, এক দিন ছুটি দিয়ে পোষাচ্ছে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও মিলছে না, আর জ্বালানিও খরচ হচ্ছে বেশি। দুই দিন ছুটি চাই। চালু হলো শুক্র-শনি।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার সেই উইকএন্ড ছেঁটে এক দিন (শুধু শুক্রবার) করে দিল। কিন্তু চার বছর যেতে না যেতেই, ২০০৫ সালে সেই বিএনপি সরকারই আবার মাথায় হাত দিয়ে বলল, ভুল হয়ে গেছে, জ্বালানি বাঁচাতে আমাদের দুই দিন ছুটির পথেই হাঁটতে হবে। আবার ফিরল শুক্র-শনি।

ব্যবসায়ীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আকুতি জানালেন, ভাই, অন্তত রোববারটা ছুটির তালিকায় ঢোকান, নইলে দুনিয়ার সাথে বাণিজ্য করব কীভাবে? কিন্তু রাষ্ট্র সেই আকুতি শোনেনি। ফলে, এরশাদ সাহেবের সেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় তাস চালনার ধাক্কা সামলে আজও আমরা প্রতি শুক্র ও শনিবার ঘরের ফ্যান ছেড়ে ঘুমাচ্ছি, আর আন্তর্জাতিক বাজার যখন সোমবার খোলে, আমরা তখন দু’দিনের বাসি ফাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ছুটি শুক্রবারে হোক আর রবিবারে, ছুটির দিন তো ছুটির দিনই! তাতে আবার অর্থনীতির কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হলো?

ঘটনাটা এখানেই মারপ্যাঁচ তৈরি করেছে।

একটু হিসাব করে দেখুন। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ—ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া—কাজ করে সোমবার থেকে শুক্রবার। আর ছুটির আমেজ উপভোগ করে শনিবার ও রবিবারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আমরা ছুটি কাটায় শুক্রবার আর শনিবারে।

ফলাফল? একটি অদ্ভুত গাণিতিক ট্র্যাজেডি!

আমরা যখন শুক্রবারে জুমা পড়ে জিলিপি খাচ্ছি বা খাসির মাংস দিয়ে দুপুরের ভাত খেয়ে ভাতঘুমে ব্যস্ত, তখন নিউ ইয়র্ক, লন্ডন কিংবা টোকিওর ব্যাঙ্ক ও অফিসগুলো পুরোদমে খোলা, তারা আমাদের ফাইল পাঠাচ্ছে। আবার তারা যখন রবিবারে সকালে ঘুম থেকে উঠে গলফ খেলছে কিংবা ফ্যামিলি পিকনিকে ব্যস্ত, আমরা তখন রবিবারে প্যান্টের বেল্ট শক্ত করে অফিসে গিয়ে বসে আছি!

অর্থাৎ, মাঝখান থেকে উভয়পক্ষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের ওভারল্যাপ কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র তিন থেকে চার দিনে! আমাদের রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন—এলসি (Letter of Credit) খোলা যাচ্ছে না, ওয়্যার ট্রান্সফার আটকে আছে, কাস্টমসের ফাইল এগোচ্ছে না, আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন থমকে আছে। স্টক মার্কেটেও দেখা দেয় অদ্ভুত এক সানডে ইফেক্ট।

চিন্তা করে দেখুন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে যদি আপনি সপ্তাহের অর্ধেক সময় অন্যের সঙ্গে যোগাযোগই না করতে পারেন, তবে তো পিছিয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক!

এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে—বাংলাদেশ তো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, ধর্মীয় ভাবাবেগের জায়গা থেকে শুক্রবার বন্ধ না রেখে উপায় আছে?

ঠিক এই জায়গাতেই অন্য অনেক মুসলিম দেশ বেশ চতুরতার সাথে সমাধান বের করেছে। পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, মরক্কো কিংবা তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলো কিন্তু অনেক আগেই নিজেদের ছুটির দিন শনি-রবিবারে রূপান্তর করেছে, কিংবা রবিবারকে মূল ছুটি বানিয়েছে।

সবচেয়ে আধুনিক উদাহরণ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২২ সালে তারা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শুক্র-শনিবারের পুরনো খোলস ছেড়ে ‘শনি-রবিবার’ উইকএন্ডে প্রবেশ করে। শুক্রবার তারা পুরো ছুটি না দিয়ে করল অর্ধদিবস বা নমনীয় কাজের সময়, যাতে মানুষ জুমার নামাজও সুন্দরভাবে পড়তে পারে, আবার আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল মার্কেটের সঙ্গেও একদম ক্লকওয়ার্কের মতো যুক্ত থাকতে পারে। ফলাফল? তাদের ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিদেশী বিনিয়োগে রীতিমতো জোয়ার এসেছে!

অথচ আমাদের দেশে ইতিহাস ও অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক আবেগ চিরকালই বেশি ক্ষমতাধর। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন (যেমন এফবিসিসিআই) বছরের পর বছর ধরে কান্নাকাটি করেও রোববারকে উইকএন্ড বানাতে পারেনি। কারণ, যে সরকারই ছুটির দিনে হাত দিতে যাবে, অমনি একদল লোক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের ধুয়া তুলে রাজপথ গরম করে তুলবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শনি-রবিবার ছুটির দিন হলে কেবল বাণিজ্যই বাড়ে না, উইকএন্ডে আন্তর্জাতিক ধাঁচে রিটেইল মার্কেট, পর্যটন এবং রেস্তোরাঁ খাতে মানুষের খরচ করার প্রবণতা প্রায় ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও এটি সহায়ক।

কিন্তু ওই যে—আমাদের রাষ্ট্রীয় ঘড়ি চলে নিজস্ব এক ঐতিহাসিক প্যাঁচালো কাঁটায়। ফলে বিশ্ববাজার যখন সোমবারে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে, আমরা তখন রবিবারের বাসি কাজ জমা করে হিমশিম খাই, আর আক্ষেপ করে বলি—আহা, রবিবারটা যদি আমাদের ছুটির দিন হতো!

← Back to News