বাংলাদেশ নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলছে

📅 April 14, 2026 👁️ 211 views 💬 Opinion
বাংলাদেশ নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলছে
কিন্তু ইতিহাসের সত্য হলো তদানীন্তন পূর্ব বাংলার মুসলিম ভোটাররাই একযোগে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়ে পাকিস্তান নামক কিম্ভূতকিমাকার রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করা বা পাকিস্তান দাবীর বাস্তবায়ন ঘটানোকে সম্ভব করে তুলেছিল। তারপরে মাত্র ২৩ বছর পেরোতে না পেরোতেই, ঐ রাষ্ট্রটিকে সেই একই বাঙালি মুসলিম বিদায় ধাক্কা দিতে গেলেন কেন?

বস্তুত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ সেকালের মুসলিম লীগ নেতারা একটি কথাই শুধু মুসলমান সমাজের মননে মগজে ঢোকাতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তান হলে সেটা হবে মুসলমানদের রাষ্ট্র। আর তা না হলে এবং ভারতবর্ষ যদি অখণ্ড থাকে, তবে মুসলমানরা হিন্দুদের নেতৃত্বাধীনে চলে যাবে।

মুসলিম লীগের এই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির সৃষ্টি হয়েছিল অতীতের হিন্দু, জমিদারদের দ্বারা মুসলিম নিপীড়ন এবং ঐ ইতিহাসকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মুসলিম লীগের উপস্থাপন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে ঐ ভেদবুদ্ধি ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন নেপথ্য খেলোয়াড় ছিল ইংরেজ শাসকেরা। যারা কিছুতেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে যৌক্তিক মনে করেনি। ভারতবর্ষকে ২০০ বছর ধরে শাসন ও শোষণ করে, ঐ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ নেহায়েত বাধ্য হয়ে ভারতবাসীর স্বাধীনতার দাবি মেনে নিলেও হিন্দু-মুসলিম বিরোধ জিইয়ে রাখে। এতে আখেরে তাদের লাভ হবে মনে করে পাকিস্তান দাবিকে গোপনে উসকে দেয়। সেদিনের সেই সাম্প্রদায়িকতার দগদগে ঘা কী ভারতে, কী পাকিস্তানে, কী বাংলাদেশে- আজও শুকায়নি। বরং দিনে দিনে যেন সাম্প্রদায়িকতা যেন নতুন শক্তি নিয়ে নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে তিনটি দেশেই।।

কিন্তু সেই পাকিস্তানের দাবি যারা বাস্তবায়নে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করলেন তাঁরা কেন নিজ হাতে ঐ সাধের পাকিস্তানকে বিদায় জানালেন? কেন ঐ কাজে হাজার হাজার মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান আদিবাসী অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিলেন? কেনই বা পাকিস্তানি মুসলিম-হিন্দু লক্ষ লক্ষ অবিবাহিত-বিবাহিত নারী ধর্ষিত হলেন? কেন কোটি কোটি মানুষ লুটপাট, অগ্নিসংযোগের শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ নির্বিবাদে হারালেন?

না, কোনও যাদুমন্ত্র বলে তেমনটি ঘটেনি। বরং অবিশ্বাস্য এ জাতীয় ত্যাগ তিতিক্ষার পশ্চাতে ছিল বাঙালি জাতির সম্মিলিত, ঐক্যবদ্ধ এবং চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতার ঘোষণা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ৭ মার্চে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে জাতির মর্মমূলে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতা বলতে বাঙালি জাতি বুঝেছিলো পাকিস্তানি অবাঙালিদেরসহ কোনও দেশি-বিদেশি শাসন, শোষণের হাত থেকে মুক্তি, দ্বিজাতিতত্ত্ব বা তদ্রুপ কোনো তত্ত্বের নামে সাম্প্রদায়িকতার হাত থেকে মুক্তি; অশিক্ষা, কুশিক্ষা, সামাজিক, ধর্মীয়, পশ্চাদপদতার হাত থেকে মুক্তি, নারীর প্রতি তাবৎ বৈষম্যের হাত থেকে ও সকল প্রকার নারী নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি, মানুষে মানুষে যে কোন ধরনের বৈষম্যের হাত থেকে মুক্তি, রাষ্ট্রীয় জীবনে সকল প্রকাশ অগণতান্ত্রিক আচরণের হাত থেকে মুক্তি।

তাই যখন এদেশের মানুষ দেখলো, পাকিস্তানে এগুলির কোনটাই প্রতিষ্ঠা করা যাবে না যখন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বন্ধ করে দিল তখন বাধ্য হয়েই বাঙালি জাতি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মাধ্যমে নয় মাসের যুদ্ধে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনলো। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো ষোলই ডিসেম্বর উনিশ শ একাত্তরে লাখো প্রাণের বিনিময়ে।

শুধুই কি সশস্ত্র যুদ্ধের বিজয়? বাঙালি জাতির? পরাজয় হলো তবে কার?
পরাজয় শুধু পাকিস্তানের নয়। পাকিস্তানের তো শোচনীয় পরাজয় হলোই। পাশাপাশি পরাজয় বরণ করল আমেরিকা, চীন ও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলির শাসকগোষ্ঠী।

এদেশগুলির পরাজয়ই শুধু নয়, সর্বাপেক্ষা উল্লেখ্যযোগ্য পরাজয় হলো পাকিস্তানের মৌলিক ভাবাদর্শ- দ্বিজাতিতত্ত্বের। কারণ বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে। তা স্পষ্টাক্ষরে লিখিত হলো বাহাত্তরের মূল সংবিধানে। এ লক্ষ্যে ঐ সংবিধানে নিষিদ্ধ করা হলো জামায়াতে ইসলামী নামক রাজনৈতিক দলসহ তাবৎ ধর্মাশ্রয়ী দলের।

পরাজিত হলো সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রের এবং তার আদর্শেরও। পরাজিত করে ঐ আদর্শের বদলে লিখিত হলো গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্রকে জনগণ এবং একমাত্র জনগণই হবে রাষ্ট্রের মালিক। থাকবে মৌলিক মানবাধিকারগুলির স্বীকৃতি। যেমন কথা বলার স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ ও আইনানুগভাবে সভা-সমিতি, মিছিল-সমাবেশ করার স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা।

বৈষম্যমূলক সকল ভাবাদর্শের নিদারুণ পরাজয়ের সম্মুখীন হলো। নারী পুরুষের বৈষম্য থাকবে না দ্ব্যর্থহীনভাবে- তা লিখিত হলো বাহাত্তরের সংবিধানে। ধর্মবিশ্বাসের ভিন্নতায়, লিঙ্গের ভিন্নতা, বর্ণের ভিন্নতার কারণে কোন নাগরিকের মধ্যে কোন প্রকার বৈষম্যই আইনত গ্রাহ্য হবে না বলে সংবিধানে লিখিত হলো।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি শোষিতের পক্ষে’। বাহাত্তরের সংবিধানে তাই অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে লিখিত হলো সমাজতন্ত্র। এভাবে পুঁজিবাদ হলো প্রত্যাখ্যাত, স্থান করে নিলো সমাজতন্ত্র। উল্লেখ্য, ষাট ও সত্তরের দশকের তরুণ সমাজও লাখো কণ্ঠে সমাজতন্ত্রের অনুকূলে শ্লোগান তুলে সারাদেশের রাজপথ মাঠ-ঘাট প্রকম্পিত করে তুলেছিল।

এহেন একের পর এক অর্জিত বিজয় যেন বিজয়ের বিশাল এক মালা গলায় স্থান করে নিয়েছিল বাঙালি জাতির। সেই বিচ্ছেদের নামই হলো বাংলাদেশ। কবিও তো তাই বলেছিলেন, ‘ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’।

কিন্তু না। চিত্রটি যতই গৌরবের হোক, যতই বিজয় অর্জিত হোক হাজারো সাহসী লড়াই এ বাংলাদেশ তা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এ সত্যও অতি অবশ্য স্বীকার্য্য। নিজেই হারিয়ে ফেলছে নিজেকে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ টিকিয়ে রাখতে পারলো না তার প্রথম সংসদে বাহাত্তর সালে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত সংবিধানটিকে। বঙ্গবন্ধুর ও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছিল যে সংবিধানে পরিপূর্ণভাবে। খুনি বলে অভিহিত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে ঐ পবিত্র সংবিধানটিকে ক্ষত-বিক্ষত করে সংযোজন করলেন ‘বিসমিল্লাহ’, যা অপর কোন মুসলিম সংবিধানেও আজতক স্থান পায়নি। একই অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী বাহাত্তর সংবিধানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামী ও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তা বদলে সেগুলিকে বৈধ ঘোষণা করলেন, তুলে দিলেন সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা শীর্ষক মৌলনীতিও।
← Back to Opinion